বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত চিকিৎসক ও নার্সদের কথাই বেশি উঠে আসে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ রয়েছে, যারা অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়—মেডিকেল টেকনোলজিস্ট। অথচ বাস্তবতা হলো, একজন রোগীর সঠিক চিকিৎসা নির্ভর করে সঠিক রোগ নির্ণয়ের উপর, আর সেই রোগ নির্ণয়ের মূল কাজটি সম্পন্ন করেন এই পেশাজীবীরা।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআইসহ নানা ধরনের ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী এবং আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, চিকিৎসা সিদ্ধান্তের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ নির্ভর করে এসব ডায়াগনস্টিক রিপোর্টের উপর। অর্থাৎ চিকিৎসক যে চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন, তার পেছনে থাকে একটি নির্ভুল পরীক্ষার ফলাফল। আর এই পরীক্ষাগুলো পরিচালনা ও বিশ্লেষণের দায়িত্ব পালন করেন মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা।
মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা স্বাস্থ্যসেবার প্রযুক্তিনির্ভর অংশে কাজ করেন। তারা মূলত ল্যাবরেটরি ও ইমেজিং বিভাগের মাধ্যমে রোগ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্টের কাজের মধ্যে রয়েছে: রক্ত, প্রস্রাব ও অন্যান্য শারীরিক নমুনা পরীক্ষা করে রোগ শনাক্ত করা; এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই ও অন্যান্য ইমেজিং পরীক্ষা পরিচালনা করা; আধুনিক ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা; রেডিয়েশন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; পরীক্ষার ফলাফলের মান নিয়ন্ত্রণ ও যাচাই করা।
এই কাজগুলো অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর। একটি ভুল পরীক্ষার ফলাফল একজন রোগীর চিকিৎসাকে সম্পূর্ণ ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। তাই দক্ষ টেকনোলজিস্ট ছাড়া আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা কার্যত অচল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জোর দিয়ে বলেছে যে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে একটি পর্যাপ্ত, দক্ষ, সুষমভাবে বণ্টিত এবং প্রণোদিত স্বাস্থ্যকর্মী বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। মেডিকেল টেকনোলজিস্টগণকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডায়াগনস্টিক সেবা, চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ, রোগী নিরাপত্তা ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
বাংলাদেশ স্বাস্থ্যকর্মী কৌশল ২০১৫, চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি, জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা রোডম্যাপে স্বাস্থ্যকর্মী উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এলাইড হেলথ প্রফেশনাল ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের নিয়ন্ত্রক কাঠামো, ক্যারিয়ার উন্নয়ন ব্যবস্থা এবং জাতীয় মানবসম্পদ পরিকল্পনায় পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞায়ন এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
গত এক দশকে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি হাসপাতালসহ অনেক প্রতিষ্ঠানেই সিটি স্ক্যান, এমআরআই, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও মলিকুলার ডায়াগনস্টিক সুবিধা চালু হয়েছে। এসব যন্ত্রপাতির প্রতিটির দাম কোটি টাকার ওপরে।
কিন্তু অনেক হাসপাতালেই আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও পর্যাপ্ত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট না থাকায় সেগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে অন্য হাসপাতালে যেতে হয়।
অথচ মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। দেশের জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্যসেবার চাহিদার তুলনায় মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সংখ্যা এখনো অনেক কম। তাদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদোন্নতি ও গ্রেড কাঠামো প্রয়োজন। একইসঙ্গে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানো দরকার।
সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত পদক্ষেপ নিলে মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা দেশের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয় সম্ভব হলে চিকিৎসার মান বাড়বে এবং ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি কমবে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক দক্ষতা বাড়বে। চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট-এই তিন পেশার সমন্বয়ে স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে।
মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের আরেকটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানে। বিশ্বের অনেক দেশেই দক্ষ ডায়াগনস্টিক পেশাজীবীর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। যদি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশি মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা বিদেশে কাজ করার সুযোগ পেতে পারেন। এতে দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।