শিক্ষার্থী সংকটের কারণে ১৮৬টি বেসরকারি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (ম্যাটস) অনুমোদন একযোগে বাতিল করেছে সরকার। টানা তিন বছর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পৃথক চিঠির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। ম্যাটস ও আইএইচটি কোর্স চালুর পর এর আগে কখনও একসঙ্গে এত প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল হয়নি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এতে চিকিৎসা শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফিরলেও দীর্ঘ মেয়াদে দেশে স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ ও টেকনিশিয়ানের সংকট আরও বাড়তে পারে। আবার বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, এ সিদ্ধান্তের ফলে অননুমোদিত ও ভুয়া স্বল্পমেয়াদি কোর্সের বিস্তার ঘটতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তিন বছরেও শিক্ষার্থী নেই
ম্যাটস বা ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (ডিএমএফ) কোর্স সরকারিভাবে চালু হয় ১৯৭৬ সালে। বেসরকারি পর্যায়ে ম্যাটস ও আইএইচটি চালু হয় ২০০৭ সালে।
দেশে বেসরকারি ম্যাটস ও আইএইচটির সংখ্যা ছিল ৩০৩টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮৬টি প্রতিষ্ঠানে গত তিন বছরে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। তাই গত জুলাই মাসে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের গভর্নিং বডি ৭২টি আইএইচটি ও ১১৪টি ম্যাটসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়। পরে গত ডিসেম্বরে এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল করে মন্ত্রণালয়।
রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে সরকারি ও বেসরকারি আইএইচটি ও ম্যাটসে প্রায় ২৭ হাজার আসন রয়েছে। তবে চলতি সেশনে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৯ হাজার। ৪০ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র সাত হাজার শিক্ষার্থী।
উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা
সাইক নার্সিং কলেজের চেয়ারম্যান আবু হাসনাত মো. ইয়াহিয়া বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় অনিয়ন্ত্রিত ও অনুমোদনহীন ছয় মাসের কোর্স বাড়তে পারে। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকে গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হবে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
পাবনা ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজির পরিচালক মো. আবু দাউদ বলেন, ভর্তি নীতিমালা কঠোর করায় শিক্ষার্থী সংকট আরও তীব্র হয়েছে। আগে ভর্তি পরীক্ষায় ২৫ নম্বর পেলেই ভর্তি হওয়া যেত, এখন তা বাড়িয়ে ৪০ নম্বর করা হয়েছে। এতে অনেক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারছে না। এর প্রভাব বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পড়বে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
আইএইচটি ও ম্যাটসের পরীক্ষা ও ফল প্রস্তুতের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের সচিব ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী পাচ্ছিল না। একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে ১৮৬টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।
স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান বলেন, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনুমোদন বাতিলের চিঠি দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে অনুমোদনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে।
যেসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল
অনুমোদন বাতিল হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে– বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল টেকনোলজি, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ইনস্টিটিউট, জনতা ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি, রেডিয়েন্ট কলেজ অব মেডিকেল টেকনোলজি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি, প্রাইম ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি, ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল টেকনোলজি, প্রিন্স ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি, জালকুড়ি ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি, কমপ্যাক্ট মেডিকেল ইনস্টিটিউটসহ অনেক প্রতিষ্ঠান।